
অভিমন্যু : চক্রব্যূহের অন্তিম সূর্য নাকি সুর্যের আলো?
মহাভারতের সেই রক্তরাঙা প্রান্তরে
যে দিন সূর্য ঢলে পড়েছিল কুরুক্ষেত্রের আঙ্গিনায়
সে দিন এক কিশোর বীর
নিজের নাম লিখেছিল আগুনের অক্ষরে অক্ষরে।
সে ছিল ভগবান কৃষ্ণের ভাগ্নে অভিমন্যু—
অর্জুনের স্বপ্ন , সুভদ্রার রক্ত, ,
যুদ্ধের ভিতর সে ছিলো এক অকাল প্রস্ফুটিত পদ্ম।
চক্রব্যূহ—
ঘূর্ণায়মান অন্ধকারের অদেখা অজানা গোলকধাঁধা,
যেন কালের পাতা ফাঁদ,
যেখানে প্রবেশ মানেই নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ বা মৃত্যু।
অভিমন্যু জানত প্রবেশের মন্ত্র,
মায়ের উদরে থাকতেই শিখেছিলো,
বের হওয়ার কথা আর শোনা হয়নি কারন
তার মা সুভদ্রার সাথে সেও ঘুমিয়ে পরে ছিলো সেদিন,
উদরে থাকা শিশু মায়ের সাথে হাসে কাঁদে খায় দায় ঘুমায়৷
তাই জানা হয়নি ফেরার পথের কথা।
যেমন আমরা জানি জন্ম,
কিন্তু জানি না মৃত্যুর দরজা কে উন্মক্ত করে
বা কারা তা কোথায় খুলে দেয় আবার।
চক্রবুহ্যের ভিতরে ঢুকেই
সে হয়ে উঠেছিলো এক অপ্রাপ্ত প্রলয়-তরবারি।
রথের চাকা ঘুরছিলো বজ্রের মতো,
ধনুকের টান ছিঁড়ে ছিঁড়ে পরছিলো অহংকারের আকাশ।
তবু চারদিক থেকে
অসংখ্য ছায়া তাকে ঘিরে ধরল—
কর্ণের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি,
দুর্যোধনের বিষাক্ত ভয়ংকর প্রতিজ্ঞা,
অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা আরো কত রথী মহরথীর মুখোমুখি হতেই
তার মৃত্যুতে দেখি যুদ্ধনীতির ভঙ্গের লজ্জাহীন প্রকাশ।
রথগুলো ভাঙল,
ধনুকগুলো ছিঁড়ল,
ঢাল ভেঙে পরল ধূলির উপর
কিন্তু তার চোখে আগুন নিভেনি তখনো।
শেষে যখন নিরস্ত্র,
মৃত্যু তাকে আলিঙ্গন করল—
সে যেন মুচকি হাসল ক্ষীণ আলোয়,
অভিমন্যু আবৃত্তি করল—
বীরের মৃত্যু পরাজয় নয়
এ তো সময়ের কাছে তার ঋণশোধ করা মাত্র।
কুরুক্ষেত্রের আকাশ
সে দিন নত হয়েছিল মাটির দিকে
বাতাস থেমে গিয়েছিল অশ্রু ও শোকের ভারে।
অভিমন্যু রক্তে লিখে গিয়েছিলো
চক্রব্যূহ ভাঙা না গেলেও আধাঁর,ভয় ভাঙা যায় সাহসে।
আজও জীবনের প্রতি মূহুর্তের জটিল ব্যূহে
যখন আমরা পথ হারাই,
এক কিশোর বীরের নাম মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনির মত
আমাদের বুকের ভেতর বেজে উঠে, অভিমন্যু,অভিমন্যু।
ভগবান কৃষ্ণের নীরবতা
মহাভারতের রক্তাভ অপরাহ্নে
সূর্য যখন কুরুক্ষেত্রের বুকে পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়,
এক কিশোর বীরের নিঃশ্বাস
ধুলো হয়ে মিশে যায় হারিয়ে যায় সময়ের মহাস্রোতে।
সে —
অভিমন্যু
চক্রব্যূহের ঘূর্ণিতে আবদ্ধ একটি দীপ্ত নক্ষত্রের গল্প।
আর দূরে দাঁড়িয়ে —
রথের লাগাম ধরে —
ভগবান কৃষ্ণ
নিরব।
সেই নিরবতা ছিলো কি নিষ্ঠুরতা!
নাকি সময়ের, প্রয়োজনের শিক্ষা? নাকি সম্মতি?
নাকি তিনি জানতেন—
যে জন্মেছে সে মরবে,
যে প্রবেশ করবে ব্যূহে নিয়তির সম্মুখীন হবেই।
তার হৃদয় কাঁপেনি?
সুভদ্রার সন্তান,
অর্জুনের রক্ত,
স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণের নিজের প্রিয় ভাগ্নে—!
ভগবান পাষন্ড নাকি নিয়তির নিয়মে বন্দি ছিলো তার হাত?
রথের চাকা ঘুরছিল,
কিন্তু তাঁর চোখে ছিল অনন্তের স্থিরতা।
কারণ তিনি দেখছিলেন
একজনের মৃত্যুতে পৃথিবীতে ঘটবে অযুত যুগের জাগরণ।
অভিমন্যুর রক্তে
আবার অর্জুনের প্রতিজ্ঞা জ্বলে উঠল,
ধর্মের আগুন আরো আরো দীপ্ত হতে থাকলো ত্রিলোকে।
নীরব কৃষ্ণ
মামা কৃষ্ণ নিরব
কাঁদলেন না বাইরে,
কিন্তু ভিতরে ভগবান কৃষ্ণের চোখ ও সৃষ্টি কেঁপে উঠেছিল।
ঈশ্বরও কখনো কখনো
হয়তো সময়ের নিয়ম ভাঙেন না—
নিয়তির সুরের নৃত্যই তো লীলা!
আজও যখন প্রতি পদে পদে জীবনের চক্রব্যূহে
আমরা একা নি:স্ব, নি:সঙ্গ হয়ে যাই,
কৃষ্ণ তখনো নীরব থাকেন—
কিন্তু সেই নীরবতাতে অদৃশ্য পথনির্দেশ থাকে।
নীরবতা শূন্য নয়,
নীরবতা কখনো কখনো অক্ষমতা নয়—
কখনো কখনো তা নিয়তির,মহাকালের সূকঠিন সিদ্ধান্ত।
কৃষ্ণ নীরব ছিলেন,
কারণ তিনি জানতেন—
বীরেরা মরে না, তারা যুগের ভিত গড়ে দিয়ে যায় সমাজে।
কংসও মামা, কৃষ্ণও মামা
মামা কংস, কৃষ্ণকে হত্যা করতে চেয়েছিলো সিংহাসন রক্ষায়
আর মামা কৃষ্ণ?
ভাগ্নে,অভুমন্যুর অকাল মৃত্য মেনে নিল বীরদের দৃষ্টান্ত হতে
অভিমন্যু
হয়ে উঠল চক্রব্যূহের অমর অন্তিম সূর্য, সুর্যের আলো।
