জীবনের তৃষ্ণার দুই দিগন্ত
মানুষ কেন বাঁচতে চায় এত?
তা আমি জানতে চাই
মৃত্যুর নীল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকেও
কেন তার বুকের ভিতরের বীজ অঙ্কুর হয়ে ফোটে—
অদৃশ্য কোনো সে ঋতুর ডাকে?
কোন একদিন প্রভাতে অরণ্যে
ঋগ্বেদ
খুলে বসেছিলাম আকাশের মতো—
মন্ত্রগুলো পাখির ডানার মতো উড়ে এসে
আমাকে বলল,
জীবন তো আগুন; তাকে জ্বালিয়ে রেখো নিভিয়ে ফেলো না
আগুন নিভে গেলে দেবতাদের মত অদৃশ্য হয়ে যায়
আরে খুঁজে পাবে না নিজে দৃশ্যমান না হলে
জীবন যে আগুন।
সেখানে শুনি—
আত্মা বহমান নদীর মতো,
দেহ? সে তো ঘাট।
ঘাট ভাঙে, নদী ভাঙে না।
পাহাড়ের ঝর্নারা যতক্ষন জীবীত নদীরা মরেও না
দিক বদলায়
বদলায় রুপ,যেমন নারী তার রুপ ও যৌবন বদল করে চলে
বয়ে চলা নদীর মত।
কঠ উপনিষদ
মানুষ ও মৃত্যুর কানে কানে বলে—
যে ঋষি সে জানে, সে ভয় পায় না কখনো মৃত্যু
ঋষির চোখে মৃত্যু বস্ত্র পরিবর্তন।
এত তৃষ্ণা তবে কেন জীবনের ?
কারণ মানুষ জানে না, বুঝে না, জানায়নি বুঝায়নি
সে অমৃতের সন্তান,
সে ভাবে—
এই দেহই তার শেষ আকাশ,শেষ গোধূলী শেষ সন্ধ্যা
শেষ রাত,শেষ ভোর,শেষ দুূপুর, শেষ অপারাহ্ন,শেষ স্বপ্ন।
হঠাৎ অন্য দিক থেকে আসা
মাটির গন্ধমাখা এক দর্শন
পায়ের ধুলো ঝেড়ে উঠে শীর দাঁড়া সোজা করে দাঁড়ায়।
সে বলে—
যতদিন শ্বাস, ততদিন আশ
ঋণ করে হলেও পান করো ঘৃত।
তুমি কি
চার্বাক দর্শনের ডালে বসতে চাও?
হতে চাও চার্বাকের শিষ্য, সন্তান?
তবে তোমার চোখ আত্মা খুঁজে পাবে না কোন দিন
খুঁজে পাবে কেবল স্পর্শের তীব্রতা।
তবে তোমার হৃদয়ে স্বর্গ মানে
এক পেয়ালা উষ্ণতা,
একটি প্রেমিকার আঙুলের আগুনের ঝলকানি।
বৈদিক ঋষিরা বলে—
থাকা উচিত তৃষ্ণা জীবনের, কারণ জীবনই যজ্ঞ।
প্রতিটি শ্বাস এক একটি আহুতি।
আবার চার্বাকও বলে—
জীবনের তৃষ্ণা থাকা উচিত, কারণ জীবনই একমাত্র ভোগ্য।
এই দুই চেতনার
মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ স্থির হয়ে যায় এগোতে পেছোতে পারে না আর,
অর্ধেক ধূপের ধোঁয়া ছোঁয়া,আর অর্ধেক জলের রক্তের গন্ধ।
জীবন সে তো কখনও তপস্যা,
কখনও তৃষ্ণা,আরাধনাও কখনো,
কখনও বলে—
আমি নিত্য।
কখনও কাঁদে—
প্রার্থনা করে আর একটু সময় দাও
হে জীবন।
তুমি কি সত্যিই প্রয়োজন? জীবন!
না কি তুমি
মৃত্যুর অন্ধকারে জন্ম নেওয়া
মায়াবী কোন নক্ষত্র? নাকি মায়া!
আমি দেখি—
এক ঋষি অগ্নিকুণ্ডে আহুতি দিচ্ছেন,
এক ভোগী মদিরার পাত্র তুলে ধরছেন আকাশে দিকে
দুজনের চোখেই একই আগুন—
বাঁচার আগুন
জীবনের তৃষ্ণা
আর কবিরা?
তারা তো আরো আরো বেশি বেশি দিন বাঁচতে চায় কবিতায়
কবিরা ঋষির দল আবার একই সাথে চার্বাক!
জীবনের তৃষ্ণা থাকা উচিত কি?
হয়তো উচিত—
যদি তা ধ্যানের দিকে জ্ঞানের দিকে মায়ার দিকে নিয়ে যায়,
হয়তো অনুচিত—
যদি তা কেবল দেহের কারাগারে বন্দি করে ফেলে।
শেষে বুঝি—
তৃষ্ণা না থাকলে সৃষ্টি নেই,
তৃষ্ণা বেশি হয়ে গেলে আবার মুক্তি মিলে না,
জীবন তাই এক মায়ার দোলনা—
এক পাশে বেদের পৃষ্ঠা,আর এক পাশে মদিরা পাত্র।
মাঝখানে মানুষ—
অমৃত আর অন্নের পণ্যশালার এক পরাবাস্তব ক্রেতা সেজে বসে আছে
ঠিক সেই শিশুটির মত যে চিনে না মুদ্রার
বুঝে না অমৃত ও অন্যের পার্থক্য
তবুও ক্রেতা সে।
তৃষ্ণাই পথ,
তৃষ্ণাই পরীক্ষা,
তৃষ্ণাই অনন্ত প্রশ্ন,তৃষ্ণাই অনন্ত সাধনা অনন্ত প্রেম
অদ্ভুত! এবার জীবন থেকে তৃষ্ণা বড় হয়ে গেলো না?
অথচ, জীবনহীন তৃষ্ণা মৃত
আবার দেখি তৃষ্ণা ছাড়া জীবন স্থবীর অচল অপাংক্তেয়।
জীবনের তৃষ্ণা এত যে মানুষেরা মরতে চায় না কখনো
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ালেও
মানুষের চোখে জ্বল জ্বল করে ওঠে অদ্ভুত আলোর কান্না
যেন শরীরগুলোর ভেতরে অনেক সূর্য লুকিয়ে রেখেছে কেউ।
এই তৃষ্ণা কিসের বলো!
মায়ার, মাটির, নাকি অমৃতের?
বৈদিক ঋষিরা বলেন—
হে মানব, তুমি দেহ নও, তুমি আত্মা।
আবার শুনিন গীতার শ্লোকের প্রতিধ্বনি—
‘ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিত…
না হন্যতে হন্যমানে শরীরে’
শরীর ক্ষয় আছে লয় আছে কিন্তু আত্মা অজ, নিত্য, শাশ্বত।
মানুষের জীবনের এত তৃষ্ণা যে
মরতে চায় না
তার বুকে চোখে মুখে বাসা বেঁধে আছে অমৃতের স্মৃতি।
মৃত্যু তো কেবল
বস্ত্র পরিবর্তনের মতো;
তবু কেন এত ভয়?
কারণ মায়া— মায়ায় বিভোর
মদ্যপ নেশায় ডুবে যায় হারিয়ে যায় অজনায় ক্ষনিকের জন্য
এই রঙিন সংসার,
হোলির রঙের মতো ছড়িয়ে আছে রক্তে, শীরা, উপশীরায়।
চার্বাক হাসে—
ধূপধুনোর ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে বলে—
যাবৎ জীবেত্ সুখং জীবেত্/মৃত্যোর না কিংচিত পরম্
এ দেহই সব, এ মাটিই স্বর্গ
আগুনে পোড়া দেহ ফিরে আসে না আর
পুনর্জন্ম কেবল কল্পনাই, কল্পনা।
মানুষের অর্ধেক ঋষি অর্ধেক চার্বাক
মানুষেরা তাই মরতে চায় না—
তাদের হাতে ধরা সত্য,সত্য মনে করে ফেলে কখনো
এই স্পর্শ, এই চুম্বন, এই ভাতের গন্ধ
এই জলের স্বাদ কি করে ভুলবে!
তারা ভাবে —
ছাঁই হয়ে গেলে হয়তো আর কিছুই থাকবে না।
এক দিকে
আত্মার অমৃত-তৃষ্ণা, অন্য দিকে আছে দেহের লালসা—
দুইয়ের মাঝখানে আটকা মানুষের দল
দুই সাগরের জোয়ার ভাটার টানে ছিন্নভিন্ন তাদের ঋষি মন।
বৈদিক আকাশ ডাকে—
এসো, প্রাণেরা মুক্ত হও,
মৃত্যু অতিক্রম করো এই তো সময়।
চার্বাক বৃৃক্ষরা চিৎকার করে বলে—
এখানেই থাকো, ভোগ,উপভোগ করো,
এই মুহূর্তটুকুই ব্রহ্ম!
মানুষ তাই মরতে চায় না— চায় না,
সে চায় অনন্তও, চায় বর্তমানও;
চায় মোক্ষ, চায় মুক্তিও, চায় স্পর্শও,চায় প্রার্থনা আরাধনাও।
মানুষের তৃষ্ণা আসলে
অমৃতেরও,
অগ্নিরও,লজ্জায় বলে না।
একটি পরাবাস্তব সেতুর উপর দন্ডায়মান মানুষেরা
যেখানে আত্মা ও দেহকে
সাথে করে প্রতি মুহূর্তের জন্য তারা আকাশে উড়তে চায় শুধু।
মাটিতে মৃত্যু জীবনের তৃষ্ণা তাদেরকে লোভী করে তুলে।
আর তখন
মানুষেরা বুঝতে পারে—
তৃষ্ণাই জীবন জীবনই তৃষ্ণা,
জীবনই প্রশ্ন এবং উত্তর,
আর তাই প্রশ্নই তাকে
মৃত্যুর বিরুদ্ধে চিরকাল,চীরকাল বিদ্রোহী করে রাখে।
আরো পড়তে এখানে ক্লিক করুন…..
