দ্রৌপদী – द्रौपदी (১)
দ্রৌপদী একদিন আয়নায় তাকিয়ে দেখল—
নিজেকে
আয়নার ভেতর পাঁচটি সূর্য,
সবগুলোর মুখ তারই,তারই ছাঁয়া তারই প্রতীক
তার চুলে রাত্রীরা ঘুমায়,
জ্বলে ওঠে যুদ্ধ,
কেশবতী সে—কিন্তু ওগুলো চুল নয়,
যেন ইতিহাসের ভবিষ্যৎ জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন।
সভাকক্ষ হঠাৎ মাছ হয়ে যায়,
রাজারা দাঁড়িপাল্লার মতো দুলছে,
পাশার ছয়টি দাগ চিহ্নগুলো চোখ খুলে তাকায়— বারবার
এক, দুই, তিন… অনন্ত অপমান।
বস্ত্র নয়, তার শরীরে মোড়ানো ছিল
নক্ষত্রের আবরণ
টান দিলে খুলে যায়—
কিন্তু শেষ হয় না,অনন্ত।
দ্রৌপদী হাঁটে—
তার পায়ের তলা ফেটে যায় আর্তনাদ করে উঠে ধর্ম,
বিদীর্ণ সত্য থেকে উঠে আসে
একটি আগুন-ফুল।
সে কাঁদে না,
কারণ তার চোখে জল নয়—
তার চোখে ভবিষ্যৎ, ইতিহাস উঁকি দেয়
তা সে বুঝেছিলো,
যেখানে নারী রমনী নয়, তৃপ্তি নয়,প্রশ্ন নয়,
নারীই মায়া, উত্তর।
রাত যখন ঘুমোতে যায়,
দ্রৌপদী তখন জেগে থাকে—
নিদ্রাহীন দ্রৌপদৌ
কারণ ইতিহাস আজও
তার কাছে ক্ষমা চাইতে শেখেনি।
আজো আমি অনেক দ্রৌপদীকে দেখি…
কুরুক্ষেত্রের ভূমি প্রস্তুত তবুও যুদ্ধ হয় না
ধর্ম মৃতবৎ,
ধর্ম মৃতবৎ মানে ন্যায়ের আশার স্বপ্নের সম্ভ্রমের আদর্শের জন্য লড়াই করার কেউ নেই,নেই।
দ্রৌপদী (২)
দ্রৌপদী,
দ্রৌপদী জন্ম নেয় আগুন থেকে
অগ্নিশিখা যার সম্রম রাখে ঢেকে—
কিন্তু কখনো আগুন তাকে পোড়ায় না,
বরং আগুনও তার ভাষা শেখে।
যজ্ঞকুণ্ডের ধোঁয়ারা সেদিন
আকাশের সঙ্গে সংগোপনে কথা বলেছিল,
ধোঁয়া বলেছিল—
এই কন্যা ইতিহাসকে অস্বস্তিতে ফেলবে একদিন
তার নাম উচ্চারণ করলে
সময় থমকে দাঁড়ায়,
যেমন বজ্রপাতের আগে আকাশ বাতাস থেমে যায়।
সে পাঁচজনের স্ত্রী নয়,
সে পাঁচটি কালের ভাগ করা বাস্তবতার একক স্বপ্নের আগুন
প্রত্যেক স্বামী তার জীবনের একেকটি দিক—
কিন্তু দ্রৌপদী নিজে একটি স্বাধীন সত্ত্বা
কারও সম্পত্তি ছিলো সে
তার চোখে আয়না নেই,
তার চোখেই আয়নার জন্ম হয় কালে কালে নয় প্রতি মুহুর্তে ক্ষনে
যে তাকায়—
সে নিজের মুখ দেখতে পায়,
আর ভয় পায়।
আবারও বলি সভাকক্ষে সেদিন
পাশার গুটি-দানাগুলো হঠাৎ হৃদয় পেয়ে যায়,
ওরা লাফাতে লাফাতে বলে—
“আমরাই ভাগ্য।”
রাজারা তখন চেয়ার নয়,
মরা গাছের মতো দাঁড়িয়ে ছিলো,
পাতাহীন যুক্তি ঝরে পড়ছিলো
তাদের কণ্ঠগুলো থেকে।
দ্রৌপদীর বস্ত্র টানা হয়—
কিন্তু সেটা কাপড় নয়,
সেটা ছিলো সময়।
টান দিলে সময় খুলে যায়,
অপমান বাড়ে,
শেষ হয় না
হতে চায় না।
সে প্রশ্ন করে—
তার প্রশ্নগুলো বাজীর ঘোড়ার মতো দৌড়ায়,
সভাক্ষকের দেওয়াল ভেঙে
আজও আমাদের মাথার ভেতর প্রবেশ করে।
কেউ উত্তর দেয় না,
কারণ উত্তর দিলে
দ্রৌপদীর নয়,তাদের নিজেদের নগ্নতা প্রকাশ পেত।
তার চুল খুলে যায়—
চুল নয়,
খুলে যায় নতুন জগৎ ও প্রতিজ্ঞা।
প্রতিটি কেশে লুকিয়ে থাকে
একেকটি যুদ্ধ।
রাত তাকে নিদ্রা দিতে চায়,
দ্রৌপদী রাতকে বলে—
“তুমি ঘুমাও,
আমাকে ইতিহাস পাহারা দিতে হবে।”
নগ্ন অথচ আগুনের পোশাকে মোড়া দ্রৌপদি আগুন ছড়িয়ে দেয় ধর্মের দূর্গে
বনবাসে সে হাঁটে—
বন অরণ্য তার কাছে নির্বাসন নয়,
বন তার কাছে সভ্যতার আয়না
দ্রৌপদী কখনো কখনো বনের জন্যও আয়না হয়ে উঠে।
বৃক্ষের পাতারা তাকে বলে—
“আমরা ঝরি,
কিন্তু অপমান করি না।”
যুদ্ধের আগে
সে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে দেখে—
জল রক্তের স্বপ্ন দেখছে
রক্তের স্বপ্ন দেখছে অশ্রু।
যুদ্ধের পরে
সে দেখে—
জয়ও এক ধরনের ভয়াবহ শূন্যতা।
দ্রৌপদী কাঁদে না,হাসেও না সহজে,
কারণ তার কষ্ট অপমান হাসির ভিতরে
অগণিত নারীর কণ্ঠ আটকে আছে।
সে কাঁদলে
আকাশ বুঝতে পারে
বৃষ্টি মানে কী।
আজও যখন কোথাও
একজন নারী প্রশ্ন করে—
“আমি কি মানুষ?”
দ্রৌপদী দূর থেকে তাকিয়ে বলে—
“আমি আছি।”
আমি মরিনি,
কারণ আগুনের আবরনে সম্রম ঢাকা দ্রৌপদীর মৃত্যু নেই।
সে কেবল রূপ বদলায়—
কখনো কবিতা,
কখনো প্রতিবাদ,
কখনো নীরবতা।
ইতিহাস আজও
তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে,
মাথা নিচু করে—
ক্ষমা চাইবার ভাষা খুঁজে,খুঁজবে।
