দ্রৌপদী (৩)
সভাঘরে সেদিন
মেঝের ওপর নয়—
সময়ের বুকের ওপর
পাশা ছোড়া হয়েছিল সময়ই তার সাক্ষী।
পাশাগুলো গোল নয়,
ওগুলো সবই মাংসাসী দাঁতওয়ালা,
ঘুরতে ঘুরতে বারবার কামড়ে ধরছিল
মানুষের শেষ বিবেকটুকু।
যুধিষ্ঠির হাত কাঁপছিল,
কিন্তু পাশা কাঁপেনি— তখনো
কারণ পাশা জানত,
আজ সে অদৃশ্য রাজা।
এক, দুই, তিন—
সংখ্যা নয়,
একেকটা কালের মহাকালের পতন।
রাজ্য পরে,
ভাই পরে,
সম্মান পরে—
শেষে পরে একজন নারী,
যাকে পাশা কোনোদিন দেখেনি চিনতেও শেখেনি।
দ্রৌপদী তখন দাঁড়িয়ে ছিল
খেলার বাইরে,
কিন্তু তারই হার যাচ্ছিল
সবচেয়ে বেশি।
আজো
দ্রৌপদীরাই হেরে চলছে খেলার আঙিনায় না থেকেও।
সে প্রশ্ন তুলেছিল—
“যে নিজেকে হারিয়েছে,
সে কি আর কাউকে বাজি রাখতে পারে?”
প্রশ্নটা পাশার গায়ে লেগে
রক্ত হয়ে গড়িয়ে পরে,
কিন্তু কেউ দেখেনি।
সভাঘর তখন
একটা বিশাল জুয়ার আড্ডা,
যেখানে ধর্মও বসে ছিল—
নীরব দর্শক হয়ে
হয়তো মৃতও।
পাশা আবার ছোড়া হয়,
এবার বাজিতে
একটা শরীর নয়,
অঙ্গ নয়
প্রত্যঙ্গ নয়
একটা অস্তিত্ব।
হায়! বস্ত্র টানা হয়—
কিন্তু সেটা খেলায় জেতার আনন্দ নেয়া শঠ ও নিষ্ঠুরের বুঝেনি
সে খেলাটায় ছিলো মানুষেরই পরাজয়।
শকুনির পাশা তখন হাসে,
কারণ, জানে—
যেখানে ভাগ্য খেলতে বসে,
সেখান থেকে ন্যায় ঘুমিয়ে থাকে।
দ্রৌপদীর বস্ত্র ফুরোয় না,
কারণ পাশা ভুল করেছিল—
সে ভেবেছিল
সবকিছু সংখ্যায় মাপা যায়।
কিন্তু নারী কোনো সংখ্যা নয়,
অপমান কোনো ফলাফল নয়,
আর ন্যায় কোনো খেলনা নয়।
দ্রৌপদী চুল খুলে দাঁড়ায়—
এই চুলে কোনো সাজ নেই,
এই চুলে জমে আছে ক্ষোভ
সব বাজির হিসাব নিকাশ।
সে বলে না “আমি হেরেছি”,
সে বলে—
“এই খেলাই তো ভুল।”
পাশার শব্দ থেমে যায়,
কিন্তু অপরাধ! অপরাধ থামে না।
যুদ্ধ আসে—
যেন পাশারই ধ্বনি, দীর্ঘ প্রতিধ্বনি।
রক্ত ঝরে,
আর পৃথিবী বুঝতে শেখে—
একটা খেলাও
মহাযুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।
আজও কোথাও
যখন ক্ষমতা পাশা ছোঁড়ে—
নারীর শরীর জীবন,
নারীর সৌন্দর্য যৌবন
মানুষের অধিকার,
সত্যের মর্যাদা নিয়ে—
দ্রৌপদী বুকে বেদনার পাহাড় রেখে দূর থেকে তাকিয়ে দেখতে থাকে,
তার চোখে কোনো বিস্ময় নেই,
থাকে শুধু ক্লান্তি।
সে জানে—
আজো পাশা বদলায়নি,
শুধু সভাঘর বদলেছে।
আর যতদিন মানুষ
খেলাকে ন্যায়ের ওপরে বসাবে,
ধর্মের ওপরে
ততদিন দ্রৌপদীরা
ইতিহাসে নয়—
হাটঁছে বর্তমানেই, হাঁটবে।
