মানুষ ও রাজনীতি (অংশ ৬)
স্বপ্ন-সংসদের এই যে নীল কালো সাদা উপাখ্যান
রাতে শহরের মাঝখানে সংসদ ভবন ঘুমিয়ে পরলে
তার গম্বুজ খুলে যায় আকাশের মতো—
ভেতরে বসে থাকে দর্শন,
তার পাশে জ্ঞান, হাতে বীণা নিয়ে স্বরস্বতী প্রকট হয়
যদি নির্বাচিতরা সহজ সরল পথে চলে।
মানবতা আসে নগ্ন পায়ে,
কেন জান? ক্ষমতার মেঝে নরম নয়;
প্রেম তাকে বসায় নিজের চাদর টেনে
রাজনীতি তখন প্রথমবার উষ্ণতার ছোঁয়া পায়।
মানুষ বের হয় জরায়ু থেকে ঢোকে প্রতিনিধি হয়ে সংসদে
আবার বের হয় প্রশ্ন হয়ে;
সত্যের সামনে পরিচয় টিকে থাকে নি কখনো,কোন স্থানে।
প্রতিশ্রুতিগুলো নবজাত শিশুদের মত কাঁদছিল,
হাসছিলো দলগুলো তাদের নিজেদের রঙে জড়াতে চাইলো।
দর্শন বলল — ওদেরকে রঙ দিও না,
তাহলে ভবিষ্যৎ জন্মান্ধদের মত চীর তরে অন্ধ হয়ে যাবে।
শপথ গ্রহণের শপথ পত্র
হঠাৎ বরফ হয়ে গেল—
যারা মিথ্যা বলল
তাদের কণ্ঠে জমলো কাঁকর ;এমন যদি হতো সত্যিই!
শঠতা যখন আয়নার সামনে দাঁড়ায়
মুখ তার দেখা যায় না— সে ধার করা চেহারায় বাঁচে যে।
সে বন্ধুত্বের ভাষায় কথা বলে,
কিন্তু বাক্যের চাকু;
হাসির ভেতর লুকানো থাকে তার একটি নিঃশব্দ প্রত্যাহার
দৃষ্টি ঘুরালে পরাজয় মৃত্যু অনিবার্য।
তখন জ্ঞানেরা প্রদীপ নেভায় না,
বরং আলো ঘুরিয়ে দেয়—অন্ধকারে যাতে নিজের রূপে ধরতে পারে চিনতে পারে তারা।
মিত্রতা ও শত্রুতা পাশাপাশি বসেছিল,
দুজনের মুখ একই; শুধু স্মৃতি,চিহ্ন, দিক,গন্তব্য, লক্ষ্য পৃথক।
যখন লাভগুলো বদলে যায়
মিত্রতা কেঁপে উঠে
যখন ভয় অনুভব হয়
শত্রুতা জন্মায় আকাশে বাতাসে মাটিতে জলে গাছের ডালে।
মানবতা মাঝে মাঝে উঠে দাঁড়িয়ে বলে—
তোমরা একই বৃক্ষের দুই ছায়া সূর্য বদলালেই
সম্পর্ক বদলায়,বুঝতে শেখো;
তাই সংসদে প্রথমবার নীরবতা পাস হলো সর্বসম্মতিতে।
প্রকৃতির সাক্ষ্য দানে
হঠাৎ দরজা ভেঙে হু হু করে বাতাস ঢুকল,
তার সাথে নদী, পাখি, ধূলো, আলো আলেয়া,
তখন প্রকৃতি জানালো—
তোমরা আমার জমিতে নীতি বানাও,কিন্তু
আমার ভাষা,আমার সৌজন্যতা,আমার ধৈর্য্য শেখোনি।
আইন বইয়ের অক্ষরগুলো পাতা হয়ে গেল,
প্রতিটি ধারা গাঢ় সবুজ;
যে বৃক্ষ আইন রক্ষা করল না,সে নিজেই গেলো শুকিয়ে।
মানুষ তখন বুঝতে চেষ্টা করলো
রাষ্ট্র মানচিত্র নয়—এটি এক বাসস্থান।
প্রেমের প্রস্তাব, হ্যাঁ,
প্রেম সংসদে বিল তুলল—
শাসনের আগে সম্পর্ক গড়ে তোল,
অনেকে অট্ট হাসি হাসল,
কারণ তারা লাভের হিসাব নিকাশ করতে এসেছিলো কেবল।
প্রেম বলল—
যেখানে মানুষ মানুষকে ভয় দেখায়,ভয় পায়
সেখানে কোনো নীতি সংবিধান টিকেনি, টেকেও না।
প্রেমের কথা শুনে
এক পাষন্ড নেতা কেঁদে উঠল—
সে কিছু ক্ষনের জন্য তার শৈশব ফিরে গিয়ে ছিলো বলে।
প্রেম মূক না হলে প্রতিবার এমনই ঘটতো।
বিরোধী দলগুলো হাততালি দিল,
সত্য এই যে হৃদয়ের আসলে কোনো দল নেই,দেশ, ধর্ম নেই।
মানুষের রূপ কেমন?
মানুষ নিজেদের মুখোশ যদি খুলে রাখে টেবিলে,
তবে দেখবে প্রতিটি মুখোশেই অন্য কারো নাম লেখা।
মানুষেরা বুঝল—
তারাই নাগরিক, শাসক, প্রেম, প্রতিবাদ,প্রতিশোধ—সবই।
রাষ্ট্র তখন স্বচ্ছ আয়না হয়ে গেল,
যে যেমন দাঁড়াল তেমনই দেশ দেখল নিজেদের চোখে।
শেষ অধিবেশন সিদ্ধান্তহীন সিদ্ধান্তে ডুবে ছিলো
রাত শেষে কোনো বিল পাশ হল না,তবু পৃথিবী বদলে গেল
পরিবর্তন প্রকৃতির ধর্ম এমন কি দেবতা অসুরও বদলে যায়।
দর্শন নীরব রইল,
আর জ্ঞান? জোসনা রেখে গেল,
মানবতা দরজা খুলে দিলো সব সংসদ
প্রেম অগণিত পাখি উড়িয়ে দিল আকাশে
পাখিরা বনেই ফিরে আসে বসে ডালে ডালে, বসবেই।
ভোরে মানুষেরা ঘুম থেকে জেগে দেখল—
দেশ ঠিক আগের মতই,কিন্তু তাদের দেখার দৃষ্টি বদলে গেছে
এবং সেই দিন থেকে
রাজনীতি আর কেবল ক্ষমতা থাকেনি
রাজনীতি,বন্য মানুষের মানুষ হওয়ার সূ-দীর্ঘ অনুশীলন।
