রাজনীতি ও মানুষ (৩য় পর্ব)
রাষ্ট্র আজকাল শুধু ধারণা নয়,
প্রেম, স্বপ্ন ও মহাকালের এক জীবন্ত সত্তা বানিয়েছি আমরা।
ক্ষমতার জন্মের আগে,
সৃষ্টির আদিতে কোনো রাজ্য ও রাজধানী ছিল না,
ছিল শুধু অশ্রুত স্পন্দন —
যেখানে ব্রহ্মাণ্ড নিজেই নিজেকে শাসন করত
নিঃশব্দ সম্মতিতে,সঙ্গমে।
মানুষ প্রথম রাজা বানাল
নিজের অদেখা অজানা ভয় থেকে,
আর প্রথম প্রজা জন্মাল
নিজের একাকিত্বকে ঢাকতে নতুন আকাংখার সন্ধানে।
রাজনীতি তখন কেবল এক আলিঙ্গন —
একজন আরেকজনকে বলছে
তুমি থাকো, আমি হারিয়ে যাবো না কোনদিন।
আকাশ তখন প্রথম সংবিধান লিখল মেঘে,
ধারা মাত্র এক —
কেউ কারো সূর্য গ্রাস করবে না ভুলেও।
নগরে প্রেম পাথর হয়ে আছে খুঁজে পায় না কেউ অস্থির বলে
শহর একদিন প্রেমে পরল গ্রামের,
রাস্তা নদীকে চিঠি লিখল —
আমি পথ হয়ে চলতে শিখেছি তোমার কাছ থেকে।
পার্লামেন্টের দেয়ালে
একটি গুল্মলতা বেয়ে উঠছিল ধীরে ধীরে,
প্রতিটি পাতায় ভোটের প্রতীক —
মানুষ, মানুষের হাত, শঙ্খ, চাঁদ,চিল, ধানশীষ, চোখ,নৌকা।
কিন্তু গুমলতা,কঁচি পাতারা শুধু আলো চেয়েছিল,
ক্ষমতা নয়,শাসন দন্ড নয়,প্রভুত্বও নয়।
নারীরা কর দিতে এসে
তাদের কপালের সিঁদুর জমা রাখল যতনে,
এক সজ্জন কর্মকর্তা বুঝল —
রাষ্ট্র আসলে মানুষের ঘর, জীবন,যৌবন রক্ষার প্রতিশ্রুতি।
সে দিন আইন গ্রন্থ বন্ধ হয়ে গেল,
কারন মায়া প্রেম হয়ে নিজেই ন্যায় ঘোষণা করেছিল।
যুদ্ধ ও আলিঙ্গন এক সাথে বিছানায় শোয়?
দুটি দেশ সীমান্তে দাঁড়িয়ে ছিল বোবার হয়ে
ঠিক দুটি লজ্জিত প্রেমিকা ও প্রেমিকের মত —
তারা যে একই নদীর জল পান করে বেঁচে ছিলো
সা়ঁতার কাঁটতো স্নান, করতো অভিসারও একই নদীতে।
সৈন্যরা রাতে শুনল
বন্দুকের ভেতর বাঁশির মধুর সুর, শব্দ,
ট্রিগার টানতেই বেরোল আাঁড়ার হলুদ কাঁঠালি ফুলের গন্ধ।
জেনারেল মানচিত্র ছিঁড়ে ফেলল —
দেখল কাগজের নিচে
একই মাটির দাগ,চিহ্ন,আহ্বান, মায়া তাকে গ্রাস করে নিলো
রাজনীতি তখন বুঝল চিনলো আয়নায় তাকিয়ে
যুদ্ধ হলো ব্যর্থ কূটনীতি নয়,
অপ্রকাশিত আকাঙ্ক্ষার ভাষা তোমাকে কেমনে বুঝাবো?
তা বুঝতে হলে আমাদের আবার মূক যুগে ফিরে যেতে হবে!
কল্পনা ও কবিতাতেও কর ও করুণার ফুলশয্যা অসম্ভব!
তবুও
কর আদায়ের দিন
রাষ্ট্র মানুষের দরজায় নয়, হৃদয়ে ভিতরে গেল।
যার চোখে জল ছিল
তার কাছ থেকে শুধু আশীর্বাদ নিয়ে ফিরলো কোষাগারে।
যার ঘরে আলো বেশি
তার জানালা খুলে দিলো দিগন্ত ও আকাশের দিকে,
আর যার ঘর ছিলো অন্ধকার তাকে
জোসনা ঋন দিলো বিনা সুদে,বিনা সাক্ষীতে।
হিসাবরক্ষক বিস্ময়ে দেখল —
অঙ্কগুলো প্রেমে পরলে
যোগফল বাড়ে, ভাগফল কমে যায়!
অর্থনীতি তখন এক সমূদ্র
যেখানে দানই স্রোত
আর সঞ্চয় কেবল উপকূল,তীর
নির্বাচনের রাত্রি,
ভোটের হচ্ছে সন্ধ্যায়, রাতে
চাঁদ ছিল প্রধান নির্বাচন কমিশনার।
সে অন্ধকার ও আলোকে ডেকে বলল —
দুজনেই জিতবে, কারণ মানুষের মাঝখানে থাকুক মায়া।
ব্যালট বাক্স খুলে দেখা গেল
সব ভোট একই নামে —
‘আমরা’ আমরা জিতেছি।
পরাজিত প্রার্থী বিজয়ীর হাতে রাখল হাত
কারণ দুজনেই বুঝে গেছে
স্পর্শে ক্ষমতা আসলে দায়িত্বের উপনাম।
এক বৃদ্ধ ঋষি রাজধানীর বুকে বসে ধ্যান করছিলেন,
পাখি ও মানুষেরা জিজ্ঞেস করল —
রাষ্ট্র কিভাবে টিকে থাকবে?
ঋষি চোখ দিয়ে বললেন —
যেমন প্রেম টিকে থাকে —
হৃদয়ে কেউ জেতে না, তবু আবার হারে না কেউ।
আইন হৃদয়ের বিরুদ্ধে গেলে
তখন তা শাসন হয়ে যায়
প্রাণ ও বোধ যদি আইনের আগে ঘুম থেকে জেগে ওঠে
তা হয় ন্যায় ও ধর্ম।
রাষ্ট্র তখন তার মুকুট খুলে রাখল
এক শিশুর হাতে —
শিশু সেটাকে খেলনা বানাল,খেলা শেষে ভেঙ্গে ফেললো
নাচতে নাচতে।
সেই বৃদ্ধ ঋষি হাসলেন —
এবার রাষ্ট্র, মানুষ, পাখি বৃক্ষরা নিরাপদ।
মুক্তি,আহা! মুক্তির স্বাদ,
শেষে মানচিত্র গলে গিয়ে হয়ে গেলো নদী,
পতাকা উড়ে গিয়ে পাখি হল,
এক নিমেশে সংবিধান মিলিয়ে গেল বাতাসে —
শুধু মানুষ রইল মানুষের পাশে সারথী সেজে।
রাজনীতি তখন প্রেম,
ধর্ম তখন প্রাণ ও প্রকৃতির সহাবস্থান,
আর স্বাধীনতা —
সে তো
দু’ জনের,তিন জনের চার জনের পাঁচ জনের নীরব সম্মতি।
এসব দেখে ব্রহ্মাণ্ড ঘোষণা করল —
যে রাষ্ট্রে ঘৃনা,ভয়ের আয়োজন নেই
সেই রাষ্ট্রই মোক্ষ।
মানুষেরা চোখ বন্ধ করে দেখল
তাদের হৃদয়ের ভেতর
এক অনন্ত প্রজাতন্ত্র জ্বল জ্বল করছে
যেখানে সকল নাগরিক একটিই — আত্মা।
কেবল মানুষ নয়,শামুক ঝিনুক
সকল প্রাণ, পাথর, পাহাড়,
পাখি, জল, ফসল, কীট-পতঙ্গও নাগরিক এ বিশ্বলয়ের।
(চলবে)
