
বিলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো একটি শিমুল গাছ—
জল আর আকাশের মাঝখানে রক্তিম উচ্চারণ,
যেন মাটির বুক ফুঁড়ে উঠে এসেছে আগুনের বৃক্ষ,
টিয়া, সাপ নাম না জানা পাখিদের আবাস ছিলো গাছটি।
শিমুলের গাছের বৈজ্ঞানিক নাম কি তখন জানতাম না,
শুধু জানতাম, সে বসন্তে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে
অনেক বড় হয়ে একজন বৃক্ষবিশারদের কাছে জেনেছি
শিমুল গাছের একাডেমিক নাম ‘Bombax ceiba’
ইংরেজি উচ্চারণ মনে রাখা সত্যিই কঠিন!
শিমুলের লাল ফুলগুলো ঝরে পরলে
বিলের জলে ভাসতো যেন অগ্নিচুম্বন,
আর তুলো উড়ে উড়ে উড়ে
মানুষের গায়ে লেগে যেতো স্বপ্নের মতো—
মেঘের মত,
কে জানে, তা তুলো ছিলো,
না কি আকাশের গোপন চিঠি!
নাকি দেবতাদের আবাসস্থল থেকে ছুটে আসা কিছু!
শিমুলের কাণ্ডের ভিতরে ভিতরে
অন্ধকারে জ্বলতো সবুজ পাতার চোখ,মুখ—
টিয়া পাখিরা বাসা বেঁধে আকাশ ও মাটির মাঝে
বৃক্ষটিকে বানিয়েছিলো এক পাখিদের দূর্গ বিহীন সাম্রাজ্য।
হঠাৎ একদিন
আমি হয়ে উঠলাম শিকারি-শিশু,
হাত কাঁপতে কাঁপতে টিয়াদের বাসায় গাছের গর্তে ঢুকে যেত
টিয়ার ছোট ছোট বাচ্চা ধরে আনতাম—
তাদের চোখে ছিলো অরণ্যের বিস্ময়,
পাখিদের ডানা কি মানুষের হাতের মত হয়?
তাদের ডানাগুলো তখনও
শিখে উঠেনি আকাশের উড়ার ব্যাকরণ।
কিন্তু আকাশ কি নিরব থাকে?
দল বেঁধে টিয়া পাখিরা নামতো বজ্রপাতের মতো—
সবুজ ঝড়, চিৎকার, তীব্র ডানার শব্দ,
ঠোটের ঠোঁকর, নখের আঁচড়
আমার শৈশবের শরীর কেঁপে উঠতো
তবুও বাচ্চাদের নিয়ে পালতাম!
তখন বুঝতাম—
বৃক্ষেরও সেনাবাহিনী আছে,
মায়েরাও আক্রমণ করতে জানে ভয়ংকর রুপে ভয়ংকর হয়ে
কিছু টিয়ার বাচ্চারা বড় হয়ে উড়ে যেতো—
আমাদের উঠোন ছেড়ে,
আমার হাতের দাগ ভুলে,
তারা ফিরে যেতো বিলের
নীল গর্ভে দুরের গাঁয়ের গাছে বা বিলের সেই শিমুলের ডালে।
কিছু থাকতো—
কিছু পোষ মানতো,
আমার ঠোঁটের শীসে,ডাকে সাড়া দিতো
তবু তাদের চোখে লেগে থাকতো
দিগন্তের সবুজ ধানক্ষেত,আকাশ, সেই শিমুল গাছের পাতা।
চারদিকে শুধু ধানগাছ,ধান—
সবুজ ঢেউ,
যেন এই বিল পৃথিবী অথবা বিশাল এক সবুজ সমূদ্র
আমি তখনো পৃথিবী বুঝতাম না, সমূদ্রও ছিল অদেখা।
আর সেই শিমুল গাছ—
বিলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক লাল স্মৃতি—
আজও হয়তো আমায় দেখলে তুলো উড়িয়ে বলবে,
শিশু, তুমি কি মনে রেখেছো আমায়?
তুমি যে টিয়ার বাচ্চাদের ধরেছিলে,
তারা আসলে তোমাকেই ধরেছিল—
তোমার বুকের ভিতরে বেঁধেছিলো বাসা,
তোমার হৃদয়ে এখনো সেই সবুজ ডানার শব্দ বাজে কি?
বিলের জলে আকাশ নুয়ে পড়েছিলো—
তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেই শিমুল গাছ,
সবুজ ও রক্তে ভেজা কোন এক নির্জন সাধু
গ্রামের কোন বয়স্ক মানুষ জানে না শিমুল গাছটির বয়স কত
কেউ বলেছে গাছটি উড়ে এসে এখানে বসতি গড়েছে,
কেউ বলেছে পরীরা এই গাছটির রক্ষক,
শিমুল গাছটি আসলে ছিলো বসন্তের গোপন বিস্ফোরণ!
ফুল ফুটলেই মনে হতো আমাকে ডাকছে,
কেউ যেন লাল রঙে লিখে দিয়েছে আকাশের মানচিত্র,
ঝরে পড়া পাপড়ি ভাসতো বিলে,
জল তখন
হয়ে উঠতো আগুনের আয়না,
ভর দুপুরেও ছুটে যেতাম শিমুল গাছের কাছে,গাছের ছায়ায়।
ভাবতাম বিদ্যালয়টি যদি এই গাছের নিচে হতো
তাহলে কেউ কোন দিন পাঠ ফাঁকি দিত না,পাঠ ভুল যেত না।
মনে হয় শিমুল গাছের তুলোর দল—
অসংখ্য সাদা আত্মার বন্ধন,
হাওয়ায় উড়ে উড়ে উড়ে
মানুষের গায়ে মুখে বুকে চোখের পাতায় লেগে যেতো,
সেগুলো তুলো ছিলো? নাকি গাছের নিঃশ্বাস তা অজানা।
শিমুলের কাণ্ডের ভিতর
এক একটি গোপন নগরী ছিলো
সবুজ ডানার সংসার করা টিয়া পাখিদের,
টিয়া পাখিরা বাসা বেঁধে
গাছটিকে বানিয়েছিলো সাম্য, প্রেমের স্বাধীনতার প্রাসাদ।
সন্ধ্যায় যখন চাঁদের আলো ঢলে পরতো
ধানক্ষেতের সবুজে সবুজে,
তখন আকাশ নিচু হয়ে শুনতো টিয়াদের পারিবারিক গল্প।
আমি তখন শিশু—
অর্ধেক নিষ্পাপ, অর্ধেক অভিযাত্রী।
হাতে মাঝে মাঝেই তুলে নিতাম নরম বাচ্চাগুলো
চোখে তাদের থাকতো বনের ভীতি,ঠোঁটে অজানা ভাষা।
বাড়ি এনে রাখতাম খাঁচায়, না হয় সুতোয় বেঁধে
রাখতাম বিছানার পাশে, রাতে জল দিতাম কলাও
কখনো খেতো কখনো খেতো না।
পরদিন সকালে আমার উঠোন হতো ছোট্ট এক অরণ্য
তাদের ডানায় আমি আমাকে, নিজেকে খুঁজে পেতাম।
কোন কোন বছর বাচ্চা বড় হয়ে
একদিন হঠাৎ উড়ে যেতো—
দিগন্তের ধানক্ষেত ছুঁয়ে, বিলের ওপরে বৃত্ত এঁকে এঁকে
আমার নাম ভুলে।
কোন কোন বছর কিছু থেকে যেতো—
আমার কাঁধে বসে শিস দিতো,
আমার ভাষা শিখতো,
তবু গভীর রাতে
তাদের চোখে জ্বলে উঠতো ওর মায়ের ছবি,আদর খুঁজতো!
চারদিকে শুধু ধানক্ষেত, ধান—
সবুজের সমুদ্র, বাতাসে দুলতো পৃথিবীর দীর্ঘশ্বাসের তাপ।
আর বিলের মাঝে সেই শিমুল গাছটি—
লাল অগ্নিস্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে—
আজও হয়তো তুলো উড়িয়ে দেয় আকাশে
কোন শিশুর গালে মুখে ধাক্কা খায়।
আমি এখন বড় হয়েছি,অনেক বড়
তবু কখনো হাওয়ায় সাদা তুলো ভেসে এলে
মনে হয়—
নাম ধরে কেউ আমায় ডাকছে আকাশে তাকাই তখন
অবচেতন মনে টিয়াদেরও খুঁজি
ইস!
আমার শৈশবের সেই টিয়া পাখিরা যদি আমার বয়সি হতো!
আমি ওদের সাথে এবার আর আমার বাড়ির উঠোনে নয়
সেই বিলের সেই শিমুলের ডালে বসে বসে
মানুষ ও পাখির জীবন যৌবন রাজনীতির গল্প শুনতাম।
টিয়া পাখিরা কি ফিরে গেছে,মরে গেছে?
নাকি তারা আমার আত্মারভিতরেই বাসা বেঁধে আছে এখনো
এ হৃদয়ের অন্ধকারে এখনো সেই
সবুজ ডানার পাখির শব্দে বিলের শিমুল গাছ কেঁপে ওঠে!
আমি আজো গ্রামের শৈশবের সেই শিমুল গাছটি খুঁজি।
(আমার শৈশবের স্মৃতি নিয়ে লেখা)

আরো পড়তে এখানে ক্লিক করুন…..

