বৃক্ষ
নিঃশব্দ দাঁড়িয়ে আছো তুমি
মাটির গভীরে ধ্যানমগ্ন যেন কোন ঋষি,ঋষির দল।
শাখায় শাখায় শ্রুতি, উপনিষদের শ্বাস
প্রেম, সুখ, সঙ্গম,স্পর্শ, কবিতা
পাতায় পাতায় কি ওসব তোমার? অদৃশ্য ইতিহাস!
তুমি কেবল গাছ নও —
আরো অনেক কিছু, তুমি পৃথিবীর প্রাচীনতম স্মৃতি।
অরণ্য দেবতা, বন দেবী,
বাতাসে যে প্রাণ,
সেই প্রাণেই অদৃশ্য ঘুমিয়ে থাকে তবে মানুষের আত্মা।
তোমার শিকড় গিয়েছে ভূঃ
তোমার কাণ্ড ভুবঃ
তোমার শীর্ষ স্বঃ —
ত্রিলোক নয় অগণিত লোক জুড়ে তোমার দেহে কি
গায় গায়ত্রী মন্ত্র?
ওম্ ভূর্ভুবঃ স্বঃ—
প্রতি সকালে সূর্য উঠলে
প্রথম আলো পরে হে বৃক্ষ তোমার কপালে,
যেন ব্রহ্মা ছুয়ে দেয় তোমায় আদরে আদরে।
তুমি অশ্বত্থ —
উর্ধ্বমূলো অধঃশাখো
গীতার উল্টো বৃক্ষ,
যার মূল পরম ব্রহ্মে
আর মানুষ কেবল রংঙ বে রঙের ঢংয়ের পাতা।
আমরা ছিঁড়ে যাই
ভেঙ্গে যাই
কেটে যাই বৃক্ষ তোমাকে অবিরত
তুমি টিকে থাকো আবার গজিয়ে উঠ।
আমরা ফল চাই,দাও, খাই
তুমি দাও মাতৃ আঁচলের ছাঁয়া
আমরা কাঠ চাই
তুমি তাও দাও, দাও জীবন
আমরা শ্বাস নেই,
বেঁচে থাকি তোমার উপর ভর করে
তুমি আমাদের জন্য নিঃশ্বাস ত্যাগ করো বৃক্ষ।
আমরা প্রাণীরা সবাই যে পরগাছা!
এই যে ত্যাগ—
এই তো যজ্ঞ, যজ্ঞ কেবল আগুনের তাপ দেয়া নেয়া নয়।
আগুনে ঘৃত অর্ঘ্য দিলেই যজ্ঞ হয় না,
নিঃস্বার্থ দানই সুন্দর, সত্য যজ্ঞ—
এ কথা প্রথম শিখিয়েছে
নীরব নিথর বোবা বৃক্ষরা।
বোবা বৃক্ষরাই আমাকে শিখিয়েছে প্রেম আত্মত্যাগ বাঁচালতা।
‘ভগবান’ শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনে বাঁশি বাজাতেন কি
যদি না কদম গাছ তা শুনত?
হয়তো গৌতম বুদ্ধ বোধি লাভ করতেন না
যদি না বৃক্ষ তাকে আশ্রয় দিত।
ঋষিরা মন্দির বানাননি— কেন!
বনে বসে কি তবে ব্রহ্ম দেখেছেন? দেখতেন?
তাই হয়তো ব্রহ্মার পুজো হয় না
কারন, যাকে দেখা যায় তার পুজো হয় কি করে!
তাই ভারত ও ধরনীর প্রথম গুরু
কোন মানুষ নয়,
একটি বৃক্ষ বা বৃক্ষরা।
তার ছায়ায় বসে
মানুষেরা প্রথম জেনেছিল—
প্রকৃতি আলাদা নয়
আত্মাই প্রকৃতি।
যে বৃক্ষ কাটে
সে নিজের নি:শ্বাস কাটে
যে বৃক্ষ রোপণ করে
সে নিজের পৃথিবী আত্মা ভবিষ্যৎ জন্ম দেয়।
হে বৃক্ষ,
তুমি স্থির হয়ে থেকেও চলমান ভাসমান মেঘের মত
তুমি নীরব হয়েও বাচাল শিশু
তুমি অচেতন হয়েও ঋষি,ঋষিরাজ
মানুষ সভ্য হয়েছে নগরে
মানুষ জ্ঞানী হয়েছে বনে,চঞ্চল হয়ে অরণ্যে
তাই আজও বাতাস এলে
পাতার সঙ্গীত শুনি—
“অহং ব্রহ্মাস্মি”
তা বলছে না কোন ঋষি,
বলছে যেন বৃক্ষ,বৃক্ষরা।
বৃক্ষ নেই মানে
জীব জীবন নেই হৃদয় নেই প্রেম নেই মেঘ নেই মায়া নেই ব্রহ্মা নেই!
