বিদুর -জন্মে দাসী পুত্র,ধর্মে রাজঋষি
রাতের সভাগৃহে
বিদুর একা বসে—
তার ছায়া যেন দাবার ঘুঁটির মতো এগোয় পিছিয়ে আসে না,
নিজেই নিজেকে চাল দেয়।
ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধ চোখে
সে বারবার আয়না ধরে,
কিন্তু আয়নার ভেতর
কেবল কাঁদে ভবিষ্যৎ।
তার জিভে ঝুলে থাকে নীতি,
কন্ঠে শাস্ত্র বোধের ঢেউ
কিন্তু শব্দগুলো পাখি—
উড়ে গিয়ে কৌরবদের কানে
রক্তে রূপান্তরিত হয়।
প্রাজ্ঞ রাজদাসী পুত্র
বিদুর হাঁটে রাজপথে,
পায়ের নিচে শাস্ত্র ভাঙে,
উপনিষদের অক্ষরগুলো
পিঁপড়ের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
সে জানে—
সত্য কখনো সিংহাসনে বসে না,
সত্য বসে থাকে দরজায়
প্রহরীর মতো।
যখন পাশা ছোড়া হয়,
বিদুর পাশা স্পর্শ করে না—
সে সময়ের কপালে
একটি শান্ত শ্লোক লিখে দেয়।
যুদ্ধের আগুনে
তার কণ্ঠ পুড়ে ছাঁই হয়,
কিন্তু সেই ছাঁই থেকেই
আবার ভবিষ্যৎ জন্ম নেয়।
বিদুর শেষে আর মানুষ থাকে না—
সে হয়ে যায়
ইতিহাসের কন্ঠ ও বিবেক,
যাকে কেউ শোনে না,
তবু সে কথা বলা বন্ধ করে না কখনো।
প্রাজ্ঞ বিদুর -জন্মে দাসী পুত্র, ধর্মে রাজঋষি….
….. …….. …… ….. …….. ……..
বিদুর ও ভগবান কৃষ্ণ : অদৃশ্য সংলাপ
চাঁদ আজ কুরুসভায় ঝুলে আছে
একটি সাদা ভাঙা শঙ্খের মতো।
বিদুর জিজ্ঞেস করে—
“হে ভগবান কৃষ্ণ, ন্যায় কি আজও বেঁচে আছে?”
ভগবান কৃষ্ণ হাসে,
তার হাসি নদীর মতো—
কিন্তু সেই নদীতে
রক্ত ও ভ্রনের প্রতিবিম্ব প্রতিফলিত হয়।
বিদুর বলে—
“আমি শব্দ দিয়ে রাজাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু শব্দগুলো তো
লোহার মতো ভারী হয়ে পড়ল।”
কৃষ্ণ পাশার ঘুঁটি হাতে নেয় না,
সে দিক বদলে সময়কে ঘোরায়
সময় ঝরে পরে যায় দ্রৌপদীর বস্ত্রের মতো,
শেষ হয় না।
বিদুর দেখে—
শাস্ত্রগুলো ধোঁয়া হয়ে উঠছে,
আর ধোঁয়ার ভেতর
সিংহাসন বসে আছে যেন একটি জীবন্ত শব।
“হে মাধব,” বিদুর বলে,
“ আজ সত্য এত দুর্বল কেন?”
ভগবান কৃষ্ণ উত্তর দেয় না—
শুধু গীতার একটি পঙক্তি
বাতাসে ছুড়ে দেয়।
পঙক্তিটি পাখি হয়ে উড়ে যায়,
কিন্তু কেউ খাঁচা খুলেনি।
বিদুর তখন আয়না ভাঙে—
আয়নার ভেতর দ্যাখে
ভবিষ্যতের যুদ্ধ কাঁপছে।
সে দেখে,
বিবেক মানেই নিরব নির্বাসন।
কৃষ্ণ বিদুরের কাঁধে হাত রাখে—
সে হাত আগুন কুন্ড নয়,
তবু ছুঁলেই
সমস্ত জড়তা মিথ্যা ভয় পুড়ে যায় এক নিমিশে।
শেষ দৃশ্যে
বিদুর একা, একা দাঁড়িয়ে,
ভগবান কৃষ্ণ নেই—
কেবল তার নিষ্ঠুর নীরবতা
ইতিহাস লিখে চলেছে ইতিহাস।
…. ……. ….. ….. ….
দূর্বোধ্য তিনটি নীরবতা
হ্যাঁ,সভাগৃহে তিনটি নীরবতা দাঁড়িয়ে—
একটি নারী,
একটি নীতি,
আর একটি স্বয়ং ভগবান!
দ্রৌপদীর চুল খুলে গেলে
রাত্রীর দরজাও খুলে যায়,
পাশার ঘুঁটিগুলো তখন
গ্রহের মতো গতি পায় ঘুরতে থাকে।
বিদুর কথা বলতে চায়—
কিন্তু তার মুখে
উপনিষদের পাতাগুলো
বরফ হয়ে জমে যায়।
ভগবান কৃষ্ণ দূরে দাঁড়িয়ে,
সে এগোয় না,
কারণ ইতিহাসকে
নিজে হাঁটতে দিতে হয়,চলতে দিতে হয়।
দ্রৌপদী জিজ্ঞেস করে না—
তার প্রশ্নগুলো
রক্ত হয়ে মেঝেতে ভাসে
প্রতিটি ফোঁটা
এক একটি ভবিষ্যৎ যুদ্ধের সংকেত।
বিদুর দেখে—
ন্যায় আজ পা হারিয়েছে,
চলার গতি থমকে গেছে,
সে বসে আছে সিঁড়ির ধাপে,
হাতের লাঠি দিয়ে
সময়ের কপাল ঠুকে দেয়।
কৃষ্ণ তখন হাসে—
সে হাসি যে করুণা নয়,
সে হাসি জ্ঞান,
যা মানুষ সহ্য করতে পারে না।
জ্ঞান কখনো আলো
বেশি বেশি আলোয় দৃষ্টি কখনো কখনো বিভ্রান্ত হয়।
শাস্ত্রগুলো পুড়ে যায় না,
শাস্ত্রগুলো হাঁটে,
তারা অন্ধ রাজার দিকে ধীরে এগোয়
চোখ ধার দিতে,সে ধার নেয় না।
দ্রৌপদীর বস্ত্র
আকাশে উঠতে থাকে উড়তে থাকে—
মেঘ হয়ে, বরফের দলা হয়ে,
আকাশ লজ্জায় লাল হয়,
আর পৃথিবী বুকে ব্যাথার পাহাড় নিয়ে মাথা নিচু করে থাকে।
বিদুর বুঝে যায়—
বিবেক মানে কেবল রক্ষা নয়,
বিবেক মানে মুহুর্ত ও কালের সাক্ষী।
শেষে তিনজনই একা—
দ্রৌপদী তার প্রশ্নে,
বিদুর তার নীরবতায়,
ভগবান কৃষ্ণ অপেক্ষায়।
আর সেই কুরুসভা?
সে এখনো আজ দাঁড়িয়ে—
প্রতিটি যুগে
নতুন নামে,নতুন পরিচয়ে।
