রাজনীতি ও মানুষ (পর্ব ১ )
রাজনীতি ও ঋষিদের আলোয়
সভামঞ্চে আজও জ্বলে ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ড —
কেউ দেখে ক্ষমতা, কেউ দেখে যজ্ঞ,কেউ অন্য কিছু।
কিন্তু ঐ যে ঋষিরা বলেছিলো —
রাজা কেবল শাসক নয়, শোষক নয়, বিধাতা নয়,রক্ষক।
প্রভাতে সূর্য উঠলে
প্রথমে আলো পরে প্রজার উঠোনে উঠোনে ঘরে ঘরে,
তারপর প্রাসাদে —
এই ছিলো রাষ্ট্রের প্রাচীন সনাতন সত্য সঙ্গত সংবিধান।
রাজনীতি শুধু সিংহাসন নয়
তবে তা হয়ে যায় কৌরবের পাশা,
আর যদি ন্যায় ও ধর্ম হয়
তখন তা কোন ভক্তের যজ্ঞের আহুতি।
যেখানে কর সংগ্রহ কষ্ট দেয়া নয়,
বরং অন্নের বীজের যোগান
যেখানে সৈন্য ভয় নয়,শক্তি নয়,
বরং ভয়ের অবসান।
ঋষিরা বলেছিলেন —
রাষ্ট্র মানে কেবল কোন এক ভূখণ্ড নয়, ঋত।
সত্যের গতিতে চলে যে সমাজ
সেই রাজ্যই তো স্বর্গ, স্বর্গ নেমে আসুক পৃথিবীর বুকে।
আজ সংসদে কোলাহল,
কিন্তু বেদে? ছিল শুধুই নীরবতা —
কারণ সত্য কখনো চিৎকার করে না
সে প্রতিষ্ঠিত হয়, কোন পাহাড়ের মতন।
যে নেতা নিজেকে হারাতে পারে, সে জয় করে নিজেকে
দ্যাখো, সে-ই প্রজাকে পরাজিত না করেও আপন করে পায়
কারণ উপনিষদ শেখায় —
বাহিরের শত্রু মিথ্যা,অন্তরের যুদ্ধই প্রকৃত বোধ,শোধ উপশম।
রাজনীতি যখন লোভের পথ বেছে নেয়
তবে তা অন্ধকার যুগের দিকহারা পথিক
আর যদি পথ নেয় মায়া ও ত্যাগের
তবে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে দেবভূমি, মানুষ, ঋষি,পাখির অভয়াশ্রম।
হে মানবসভ্যতা —
ক্ষমতা নয়, সখ্যতা, সমতা, ন্যায় ও ধর্মকে কেন্দ্র করো,
তবেই সংসদ হবে মানুষের আলোকিত মহাসভা,
আর দেশ হবে স্বপ্নের পৃথিবী, স্বপ্নের পৃথিবী হবে স্বর্গ।
*
সংসদ ভবন আজকাল এক বিশাল যজ্ঞবেদী —
মাইক্রোফোনগুলো কুশদণ্ড যেন,
আর বক্তৃতা ধোঁয়া হয়ে উড়ছে মহাকাশে
যেখানে দেবতারা নয়, অসুরেরা বসে শুনছে অশ্রাব্য কিছু।
নির্বাচনের ব্যালটগুলো হায়
মাটির নিচে বপন করা যেন কোন মন্ত্র —
ফল হয় পাঁচ বছর পর,পর
কিন্তু বৃক্ষ জন্মায় মানুষের চেতনায় আঘাত করে করে।
দেখলাম এক মন্ত্রী নিজের ছায়াকে শপথ বাক্য পাঠ করাল,
ছায়া বলল — আমি তো তোমারই অন্ধকার।
তখন সূর্য পশ্চিমে ডুবতে ডুবতে মুসকি হেসে বলল,
ঋত ভাঙলে দিকও বদলায়, তা মনে রেখো।
রাষ্ট্রপতির কলমে কালি ছিল না — সেদিন
ছিলো গঙ্গার তীব্র স্রোত,
প্রতিটি স্বাক্ষর একেকটি উচু জল তরঙ্গ
যা ভবিষ্যতের উপকূলে আছড়ে পরে পূর্ব ঘোষনা ছাড়াই।
একজন দরিদ্র কৃষক একদিন স্বপ্নে দেখল
তার করের টাকায় গড়া প্রাসাদগুলো একে একে
রাতে গাছ হয়ে গেছে —
মন্ত্রীদের চেয়ারগুলো হয়ে গেছে সব পাখিদের বাসা।
বেদ তখন বাতাস হয়ে জানিয়ে দিলো —
রাজা মানে প্রভু নয়, কেন্দ্র নয়, পরিক্রমা;
যে ঘুরে প্রজার চারপাশে অবিরাম
সেই সূর্য, বাকিরা গ্রহ, উপগ্রহ হয়তো আরো অনেক কিছু।
আইনগ্রন্থ খুলতেই
অক্ষরগুলো ঋষি হয়ে বসে পরল গভীর ধ্যানে,
কারণ ন্যায় লেখা যায় না কখনো
যতক্ষণ না হৃদয় তা উচ্চারণ করে মন্ত্রের আবহ নিয়ে।
এক সেনাপতি যুদ্ধ ঘোষণা দিতেই
তার তলোয়ারগুলো সাদা গোলাপ ফুলে পরিণত হল —
হিংসা বুঝল
প্রকৃতির ভাষা বুঝে না কোন যুদ্ধ বিগ্রহ কূটবীতি রক্তস্রোত।
কর আদায়ের হিসাবের খাতা কোন এক রাতে
স্বপ্নে স্বরস্বতী নদী হয়ে গেল,
যার স্রোত উল্টো বয়ে গিয়ে
প্রবেশ করল শাসকের প্রাসাদ ও পাষান হৃদয়ে।
শেষে রাষ্ট্র নিজেই নিজের কাছে জিজ্ঞেস করল —
আমি কি মানচিত্র, না মানুষের ভ্রম?
উপনিষদের নীরবতা উত্তর দিল —
যেখানে আত্মা নিরাপদ, সেখানেই সব প্রেম ঘুমিয়ে থাকে।
…
