মানুষ ও রাজনীতি (অংশ ৫)
আমি থেকে আমরা
প্রথম মানুষ যখন বললো, “আমি”
মহাবিশ্ব একটু একটু করে কেঁপে উঠল —
ওই আমিটা ছিলো একতা ভেঙে প্রথম সীমারেখা আঁকা।
দ্বিতীয় মানুষটি যখন বলে উঠলো “তুমি”
জন্ম নিল, স্থান
সৃষ্টি হতে থাকলো দূরত্ব।
আর যখন বলা হল “আমরা”
জন্মাল — রাষ্ট্র
অদৃশ্য, অথচ অনেক অনেক ভারী।
সেই দিন থেকেই রাজনীতি গণিত
ভূগোল নয়, বিজ্ঞান নয় হয়ে উঠলো মনস্তত্ত্ব,
মানচিত্র আসলে কাগজে নয়, আঁকা হয় স্মৃতিতে।
একদিন দার্শনিকরা আবিস্কার করলো
মানুষের মাথার ভেতর একটি নগর আছে —
তাই চিন্তা তার নাগরিক,
সিদ্ধান্ত তার সংসদ হতে চায় আনমনে।
যুক্তি সেখানে আইনমন্ত্রীর মত
কামনা সে যেন বিরোধী দল,
আর স্মৃতি — পুরনো সংবিধান,কিছু মনে পরে,কিছু ভুলে যায়।
স্বপ্ন প্রতি রাতে পরির রুপে আসে বিপ্লবী সাজে বিপ্লব ঘটায়
কিন্তু ভোর হলে?
নকশি কাঁথা
টানতে টানতে বাস্তবতা পুনরায় সরকার গঠন করে ফেলে।
মানুষ তাই এক চলমান রাষ্ট্র —
নিজেকেই প্রতিদিন শাসন করে,করে শোষন! তোষনও।
প্রতিটি সিদ্ধান্ত এক একটি ভোট,
প্রতিটি অভ্যাস নির্বাচিত প্রতিনিধির মত অক্টোপাশ
আমি যাকে বারবার বেছে নেই সেই আমার ভাগ্য হয়।
লোভীরা ক্ষমতায় পেলে
নৈতিকতা বনবাসে যায় কোন সৎ মায়ের ষড়যন্ত্র ছাড়াই
করুণা ক্ষমতায় এলে আইন বিধি কমে যেতে থাকে।
মানুষ ভাবে ভোটে সে নেতা নির্বাচন করছে —
আসলে সে নিজের ভবিষ্যৎ লিখে চলে ভুলে বা ভাবনায়।
বিভক্ত আত্মা,
যখন মন এক কথা বলে
বুদ্ধি আরেক —
সেখানে তখন গৃহযুদ্ধের সূচনা হয়।
বাইরের যুদ্ধ
ভেতরের দিধা -দ্বন্দ্বের প্রতিফলন কজনে তা বুঝে?
এক সেনাপতি একদা ধ্যানে বসে দেখল
তার প্রকৃত শত্রু তার নিজেরই অজ্ঞাত কোন ভয়,
তার অস্ত্র? তারই অজ্ঞতার বিমূর্ত প্রতিচ্ছবি।
সে তলোয়ারটি সৈনিক মাটিতে পুঁতে দিল —
সেই স্থানেই একটি বৃক্ষ জন্মাল মূহুর্তেই।
মানুষ একে শান্তিচুক্তি বলল,
প্রকৃতি বলল — এতো স্বাভাবিক অবস্থা প্রান ও প্রানীর।
রাষ্ট্রের আদালত দেরি করতে পারে বিচারের রায়,শোনাতে
প্রতিটি কাজ তার নিজেরই সাক্ষী।
কেউ অন্যর সাথে প্রতারণা করলে
সে প্রথমে নিজের বাস্তবতার তৈলচিত্র ও দেয়াল ভেঙে ফেলে
কারণ জগৎ অভিজ্ঞতার কুয়াশা, প্রতিধ্বনি।
কর্মফল শাস্তি নয়,
শিক্ষা নয়, বকেয়া নিজের মজুরির
সময় বিচারক নয় — আয়না।
মুদ্রা জমা থাকে না,
চলাচল করে অন্যের ইচ্ছায়।
যেখানে আটকে যায় সেখানে দারিদ্র্য,
যেখানে প্রবাহিত সেখানে আসে সমৃদ্ধি।
দান মানে কমে যাওয়া নয়, প্রবাহে অংশ নেওয়া।
যে কেবল নেয়ই, আর নেয়
সে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের আত্মা থেকে।
যে দেয়
সে প্রবাহের অংশ হয়, অমর হয়,গাছের পাতার মত
সে ঝরে পরে আবার গাছেই শোভা পায় আগের মত৷
প্রতিটি রাজ্য, সাম্রাজ্য প্রথমে বাইরে বাড়ে,
তারপর ভিতরে ফাঁপা হয়,ঘুনে ধরা কাঠের মত দূর্বল হয়।
যখন প্রতীক
বাস্তবের চেয়ে বড় হয় পতাকা মানুষকে ঢেকে দেয় আচলে।
রাষ্ট্র তখন নিজের ছায়া রক্ষা করতে গিয়ে নাগরিক হারায়।
ইতিহাসে পতন মানে ধ্বংস নয় স্মৃতির সংশোধন যদি বোঝ।
অদৃশ্য শাসন সুখ আনে
তা দেখে শেষে এক ঋষি বললেন —
সেরা সরকার তো সেই-ই
যার উপস্থিতি অনুভূত হয় না দূর্বলের দৃষ্টিতে।
রাষ্ট্র তখন থাকে কিন্তু বোঝা যায় না —যেমন দেহে প্রাণ।
নক্ষত্রেরা সংঘর্ষ জড়ায় না
তারা নিজেদের কক্ষপথ জানে,চিনে,বুঝে।
মানুষের রাজনীতি হবে শেষ, হবেই
যেদিন সে নিজের প্রকৃতিটা জেনে যাবে।
তখন সংসদ হবে সংলাপ,
আইন হবে অভ্যাস,আর স্বাধীনতা হবে স্বভাব।
শেষ সত্য —রাষ্ট্র বাহিরে নয়,
এটি সমষ্টিগত চেতনার সুশ্রী অবয়ব।
যে দিন মানুষ জাগবে
সে দিন শাসক, শাসিত, শাসন —
তিনটিই এক হয়ে এক সারি তে দাঁড়াবে হাসি মুখে।
